বাংলাদেশে বন্য প্রানীদের বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশে বন্য প্রানীদের বর্তমান অবস্থা

বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সারা পৃথিবীবাসী দুটি প্রাণঘাতী বিশ্বযুদ্ধসহ মোট আনুমানিক ৩০টি যুদ্ধের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। এসব প্রাণঘাতী এবং ভয়ঙ্কর যুদ্ধে প্রায় ২৭ কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করলেও আজো বিশ্বের সুপার পাওয়ার এবং আঞ্চলিক প্রভাবশালী দেশগুলোর মন থেকে পশুত্ব এবং হিংস্রতা কখনোই বিলীন হয়ে যায়নি। বিশেষ করে আমাদের প্রকৃতির এক বন্ধু চড়ুই পাখির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এশিয়ার মহা প্রাচীরের দেশ চীন কিন্তু বিশ্বের বুকে এক কলঙ্কজনক এবং জঘন্য কর্মকাণ্ডের ইতিহাস সৃষ্টি করে রেখেছে। মুলত ১৯৫৮ সালে চীনের কমিউনিস্ট শাসকের প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুং সরকার নজিরবিহীনভাবে চড়ুই পাখির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। আর এতেই সারা চীন জুড়ে শুরু হয়ে যায় নিরীহ চড়ুই পাখি নিধন এবং হত্যাকাণ্ড।

বিভিন্ন প্রতিবেদনের হিসেবের তথ্যমতে, শুধুমাত্র ১৯৫৮ সালেই চীনের সকল জনসাধারণ সম্মিলিতভাবে অতি উৎসাহের সাথে সারা দেশে প্রায় ১০ কোটির অধিক চুড়ুই পাখি হত্যা করে। এই নিরীহ চড়ুই পাখিদের বিরুদ্ধে চিনের মাও সেতুং সরকারের একটাই অভিযোগ ছিল পাখিগুলো নাকি দেশের জমির ফসল খেয়ে ফেলছে। অবশ্য প্রকৃতিও কিন্তু তার নিয়ম মতো এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে মোটেও কোন দেরি করেনি। পরিকল্পিত চড়ুই পাখি হত্যাকাণ্ডের ঠিক পরের বছরেই চীনে ভয়াবহ খাদ্যভাব এবং দূর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৯৫৯ সালে চীনজুড়ে ফসলহানীর পাশাপাশি ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে এবং চরম দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয় দেশটি। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত মাত্র ৩ বছরের স্থায়ী দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩.৬ কোটি সাধারণ লোক চরম খাদ্যভাবে এবং অনাহারে মারা যায়। তবে ইদানিং আমাদের দেশেও প্রকৃতির অবালা ও নিরীহ প্রাণীর প্রতি ধ্বংসাত্বক আচরণ এবং হিংস্রতা চরমভাবে ফুটে উঠেছে। আজ আমাদের দেশের অধিকাংশ পাহাড় ও বনজঞ্জল কেটে সাফ করে দেয়া হচ্ছে।

চুড়ুই পাখি

দেশে কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোতে চলছে নির্বিচারে পশুপাখি হত্যা ও নিধন। কিছুদিন আগে ভারতের সীমান্ত অতিক্রম করে একটি বিরল প্রজাতির নীলগাই পঞ্চগড়ের গিরিগাঁও গ্রামে ঢুকে পড়ে। এতে করে স্থানীয় অতি উতসাহী শতাধিক অমানুষের দল তাকে ধাওয়া করলে শেষমেশ হার্টএ্যাটাক করে মারা যায় নীলগাইটি। তাছাড়া গত ২০২১ সালের জুলাই মাসেও ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশৈকৈল উপজেলার মুক্তারবস্তি গ্রামে স্থানীয়দের তাড়ায় বিলুপ্তপ্রায় একটি নীলগাই মারা যায়। এদিকে দেশের উত্তর অঞ্চলের চলনবীলে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও আইন উপেক্ষা করেই সারা বছর ধরে চলে অতিথী পাখি নিধন ও হত্যাকাণ্ড। আবার তার পাশাপাশি দেশের আইনকে অবজ্ঞা করেই চলনবিলের বুকে চলছে অবৈধ পুকুর খনন এবং প্রাকৃতিক খাল-বিল ধ্বংসের মহা কর্মকাণ্ড। চলতি ২০২২ সালের ২১শে জানুয়ারি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার কাচুয়া এলাকায় বিপন্ন প্রজাতির একটি চিতা বিড়ালকে পিটিয়ে হত্যার পর মিছিল করে উল্লাস করেছেন এলাকার কিছু লোক।

এভাবে আমরা প্রতিনিয়ত দেশের প্রকৃতি এবং বন্য প্রাণীকুল ধ্বংস ও নির্বিচারে হত্যা করে গেলেও এক দিন না একদিন ঠিকই কিন্তু প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিতে কোন রকম দ্বীধা করবে না। তাই আসুন আমরা সবাই নিষ্ঠুরতা পরিহার করে দেশের প্রকৃতি এবং তার বন্যপ্রাণীর ও পাখির প্রতি সদয় আচরণ করি এবং নিজ দেশকে রক্ষা করি।

লেখক: সিরাজুর রহমান (Sherazur Rahman)

সহকারী শিক্ষক ও লেখক,

গ্রামঃ ছোট চৌগ্রাম, সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ।