ভারতে ও বাংলায় ইউরোপীয়দের আগমন

ভারতে ও বাংলায় ইউরোপীয়দের আগমন

অতি প্রাচীনকাল ‍থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশ ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। মধ্যযুগে বণিকগণ উপমহাদেশের বিভিন্ন পণ্যদ্রব্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চালান করত। ক্রমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বণিকগণ উপমহাদেশে আসার জলপথ আবিষ্কারের জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে। তারই ধারাবাহিকতায় পর্তুগিজ নাবিক বার্থোলোমিউ দিয়াজ ১৪৮৭ সালে আফ্রিকার উত্তমালা অন্তরীপ হয়ে ইউরোপ হতে পূর্বদিক আগমনের জলপথ আবিষ্কার করেন। সেই সূত্র ধরে ইউরোপ হতে ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কৃত হয় ১৪৯৮ সালে। পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা এই জলপথ আবিষ্কার করেন। তিনি আফ্রিকা মহাদেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ উপকূল ঘুরে ইউরোপ থেকে ভারতের কালিকট বন্দরে উপস্থিত হন। পরবর্তীতে বিভিন্ন ইউরোপীয়দের  আগমন ঘটে বাংলায় । ভারতবর্ষে মূলত পাঁচটি দেশের বণিকদের বাণিজ্যের জন্য আগমণ গটেছিলঃ

১. পর্তুগিজদের আগমন।

২. ওলন্দাজদের আগমন।

৩. দিনেমারদের আগমন।

৪. ইংরেজদের আগমন।

৫. ফরাসিদের আগমন।

পর্তুগিজদের আগমন

আগমন ১৫১৬ সালে। ফিরিঙ্গি নামে পরিচিত ছিল। ১৫১৬ সালে বাংলায় আগমণ ঘটে। আলবুকার্ক ভারতে পর্তুগীজ উপনিবেশ গুলোর প্রথম গভর্নর ছিলেন। পর্তুগিজ জলদস্যুদের বলা হত হার্মাদ। ভারতের প্রাচীন নাম জম্মুদ্বীপ। ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কারের কৃতিত্ব পর্তুগিজদের। পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা ভারতবর্ষে আগমন করেন ১৪৯৮ সালে। সুবাদার শায়েস্তা খান পর্তুগিজদের সম্পূর্ণরূপে দমন করেন। সম্রাট আকবরের আমলে পর্তুগিজরা এদেশে ব্যবসা বাণিজ্য করার অনুমতি পায়। পর্তুগিজগণ প্রথম বাংলায় ঘাঁটি স্থাপন করেন ১৫১৬ সালে।

ভাস্কো-দা-গামা

ওলন্দাজদের আগমন

পর্তুগিজদের পরে আসে ডাচ্ বা ওলেন্দাজগণ। ওলন্দাজরা বাংলায় আসেন ১৬০২ সালে। ওলন্দাজগণ যে দেশের নাগরিক হল্যান্ড বা বর্তমান নেদারল্যান্ডসের। ওলন্দাজগণ উপমহাদেশে ঘাঁটি স্থাপন করেন মুসলিমপট্টমে।

ইংরেজদের আগমন

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী গঠিত হয় ১৬০০ সালে। ইস্ট ইন্ডিয়া ‍কোম্পানী বাংলায় আমে ১৬০৮ সালে। ইংরেজদের বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের অনুুমতি দেন সম্রাট জাহাঙ্গীর। দ্বিতীয়বার এসে কুঠি স্থাপনের অনুমতি পান জব চার্ণক। ইংরেজরা কলকাতার আশেপাশের ৪৮টি গ্রমা ক্রয়ের অনুমতি পায় সম্রাট ফররুখশিয়ার কাছ থেকে। ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে বাংলার দেওয়ানী লাভ করে ২য় শাহ আলম। ইংরেজরা কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ নির্মাণ করে ১৭০০ সালে। ইংরেজরা বাংলায় প্রথম কুঠি স্থাপন করে পিপিলাইয়ে। কলকাতা নগরী প্রতিষ্ঠা করেন জব চার্ণক।

দিনেমারদের আগমন

উপমহাদেশে দিনেমার নামে পরিচিত ছিল ডেনমার্কের অধিবাসী। দিনেমারগণ তাদের বাণিজ্য কুঠি বিক্রি করে দেয় ইংরেজদের নিকট। দিনেমারগণ ডেনিস ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী গঠন করে এদেশে আসে ১৬১৬ সালে।

ফরাসিদের আগমন

ফরাসিরা বাংলায় আসেন ১৬৬৮ সালে। উপমহাদেশে ইউরোপীয় সাম্রাজ্য স্থাপনের প্রথম চেষ্টা করেছিল ফরাসিরা। ইউরোপীয়দের মধ্যে সর্বশেষ উপমহাদেশে আগমন করে ফরাসিরা। ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী গঠিত হয় ১৬৬৪ সালে। ফরাসিরা সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে ১৬৬৮ সালে। ফরাসিরা তাদের ফ্যাক্টরী নির্মাণ করে চন্দন নগরে। উপমহাদেশে যে দুই ভিন্ন জাতি পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত ছিল ইংরেজ ও ফরাসি। বাংলায় ফরাসিদের শ্রেষ্ঠ কুঠি ছিল চন্দন নগরে। ইংরেজরা চন্দন নগর দখল করে ১৭৫৭ সালে 

ইংরেজ শাসন (১৭৫৭-১৯৪৭)

বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয় কোম্পানি প্রথমে বাণিজ্য করতে আসে এদেশে। ধীরে ধীরে শক্তি বাড়াতে থাকে তারা, ফলে বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সাথে তাদের বিরোদ বাঁধে। এরই পথ ধরে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন মুর্শিদাবাদের পলাশীর প্রান্তরে সংঘটিত হয় পলাশীর যুদ্ধ। যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে ইংরেজরা যে শক্তি সঞ্চয় করে পরবর্তী সময়ে বক্সারের যুদ্ধে দমীর কাসিমকে পরাজিত করে তা আরও সংহত করা হয় । এভাবে বাংলায় ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠা প্রায় নিশ্চিত হয়।

ইংরেজ শাসন

ইংরেজ শাসনের ঘটনা প্রবাহ

১৬০০  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী গঠন। ১৬০৮  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর উপমহাদেশে আগমন এবং সুরাটে প্রথম কুঠি স্থাপন। ১৭০০ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ নির্মাণ করে। ১৭৫৭  পলাশীর যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দ্দৌলার পতন হয়। বাংলায় স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। বাংলায় ইংরেজ শাসনের সূচনা হয় এবং বাংলায় নবাবী শাসনের পতন ঘটে। ১৭৬৪ বক্সারের যুদ্ধ। মীর কাশিম যুদ্ধে ইংরেজদের নিকট পরাজিত হন। তিনি । এই যুদ্ধে ফকির সন্ন্যাসীদের সাহায্য কামনা করেন। ১৭৬৫ লর্ড ক্লাইভ সরাসরি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। লর্ড ক্লাইভ বাংলার প্রথম গভর্নর হিসেবে দ্বৈত শাসন কায়েম করেন। ১৭৭০ বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় যা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত। ১৭৮০ বাংলায় সংবাদপত্র ‘বেঙ্গল গেজেট প্রকাশ। ১৮১৫ রাজা রামমােহন রায়ের ‘আত্মীয় সভা’ গঠন। ১৮২৮ রাজা রামমােহন রায়ের ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা। ১৮২৯ সতীদাহ প্রথাকে অমানবিক ও সামাজিক অপরাধ ঘােষণা করে আইন। প্রণয়ন করেন লর্ড বেন্টিঙ্ক। ১৮৩৯ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তত্ত্ববােধিনী সভা প্রতিষ্ঠা। ১৮৫৩ উপমহাদেশে প্রথম রেল গাড়ি চালু করেন লর্ড ডালহৌসি। ১৮৫৫ হিন্দু কলেজের নামকরণ হয় প্রেসিডেন্সি কলেজ। ১৮৫৭ সিপাহী বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে মুঘল শাসনের অবসান ঘটে। ১৮৫৮ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অবসান এবং রাণীর শাসন শুরু। ১৮৬০ ঢাকায় দীনবন্ধু মিত্রের নীল দর্পণ নাটক বেনামে প্রকাশ।১৮৬২ দর্শনা থেকে কুষ্টিয়া রেল লাইন স্থাপন। ১৮৬৩ মুসলিম সাহিত্য সমিতি গঠন (আবদুল লতিফ)। ১৮৬৪  ঢাকা প্রথম পৌরসভা হয়। ১৮৭২ উপমহাদেশে প্রথম আদমশুমারী প্রচলন (লর্ড মেয়ো)।১৮৭৭ মুসলমানদের প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল মােহামেড এসােসিয়েশন গঠন। ১৮৮৫ সর্ব ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা। ১৯০১ ঢাকার আহসান মঞ্জিলে প্রথম বৈদ্যুতিক বাতির প্রচলন। ১৯০৪ লর্ড কার্জন কর্তৃক ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট প্রণয়ন। ১৯০৫ লর্ড কার্জন কর্তৃক বঙ্গভঙ্গ। ঢাকা প্রথম প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা পায়। ১৯০৬ নবাব স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে ঢাকার শাহবাগে মুসলিম লীগ গঠন। স্বদেশী আন্দোলনের সূত্রপাত এবং নারীর সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ। 

১৯০৮ ক্ষুদিরামের ফাসি। ১৯০৯ মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনের দাবী নিয়ে মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন । ১৯১১ বঙ্গভঙ্গ রদ। ১৯১২ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নাথান কমিশন গঠন। ১৯১৩ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যে নােবেল অর্জন। ১৯১৪ লর্ড হার্ডিঞ্জ কর্তৃক পাবনায় হার্ডিঞ্জ ব্রীজ নির্মাণ। ১৯১৬  হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির লক্ষ্যে লক্ষৌ চুক্তি স্বাক্ষর। খেলাফত আন্দোলনের সূচনা। ১৯২১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। ১৯৩০ সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন। ১৯৩৪  সূর্যসেনের ফাঁসি। ১৯৩৫ লর্ড ওয়েলিংডন কর্তৃক ভারত শাসন আইন পাশ। ১৯৩৭ প্রাদেশিক নির্বাচনে এ.কে ফজলুল হক মূখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৩৮ শের-ই-বাংলা কর্তৃক ঋণ সালিশী বাের্ড প্রতিষ্ঠা। ১৯৩৯ মােহাম্মদ আলী জিন্নাহ কর্তৃক দ্বিজাতি তত্ত্ব ঘােষণা। ১৯৪০ শের-ই-বাংলা কর্তৃক লাহাের প্রস্তাব উত্থাপন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারত শাসন আইন পাশ। ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের  জন্ম এবং ১৫ আগস্ট ভারত রাষ্ট্রের জন্ম।