উপমহাদেশে ইসলামের আবির্ভাব

উপমহাদেশে ইসলামের আবির্ভাব

সিন্ধু বিজয়ঃ উমাইয়া ‍খলিফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের রাজত্বকালে মুসলমানদের বিজয়াভিযান শুরু হয়। খলিফা ওয়ালিদের রাজত্বকালে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ সমূহের শাসনকর্তা ‍নিযুক্ত হন। তিনি ৭১২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জামাতা মুহম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু রাজা দাহিরের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরণ করেন। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের ফলে উপমহাদেশে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে।

হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ছিলেন ইরাকের শাসনকর্তা। মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু জয় করেন ৭১২ সালে। রাষ্ট্রীয়ভাবে উপমহাদেশে ইসলামের সূত্রপাত হয় ৭২১ খ্রিস্টব্দে। আরবদের সিন্ধু বিজয়ের প্রাক্কালে সিন্ধুর রাজা ছিলেন দাহির। মুসলমানরা সিন্ধু বিজয়াকালে ইরাকের শাসনকর্তা ছিলেন হাজ্জাজ বিন ইউসুফ। ‍সিন্ধু অভিযানে মুসলিম সেনাপতি ছিলেন মুহাম্মদ বিন কাসিম। মুহাম্মদ বিন কাসিম সর্বপ্রথম ও দেবল বন্দর জয় করেন।

সুলতান মাহমুদের ভারত আক্রমণঃ সুলতান মাহমুদ শাসনকর্তা ছিলেন গজনীর (৯৯৬–১০৩০)। সুলতান মাহমুদ ভারত আক্রমণ করেন ১৭ বার। সুলতান মাহমুদের সভাকাবি ছিলেন ফেরদৌসী। ফেরদৌসীর রচিত অমর কাব্যগ্রস্থের নাম শাহনামা। ফেরদৌসীকে বলা হয় প্রাচ্যের হোমার। সোমনাথ মন্দির অবস্থিত ভারতের গুজরাটে। সুলতান মাহমুদ সোমনাথ মন্দির আক্রমণ করেন ১০২৬ সালে। সুলতান মাহমুদের রাজ্যসভায় নামকরা দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদ ছিলেন আল বেরুনী।

সুলতান মাহমুদ

উপমহাদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠাঃ ময়েজউদ্দিন মুহম্মদ বিন ইতিহাসে শিহাবউদ্দিন মুহম্মদ ঘুরী নামে পরিচিত। গজনীতে ঘুুর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হলে মুহম্মদ ঘুরী উপমহাদেশে তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন। তরাইনের প্রথম যুদ্ধ ১১৯১ সালে মুহম্মদ ঘুরী ও পৃথ্বীরাজ চৌহানের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। মুহম্মদ ঘুরী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। ‍দ্বিতীয় যুদ্ধ ১১৯২ সালে মুহম্মদ ঘুরী ও পৃথ্বীরাজ চৌহানের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। পৃথ্বীরাজ চৌহানের পরাজিত ও নিহত হয়। ঘুরীর জয় লাভের মধ্য দিয়ে মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধের পর মুহম্মদ ঘুরী উত্তর উপমহাদেশের শাসনভার তাঁর সুযোগ্য সেনাপতি কুতুবুদ্দিনের উপর ন্যস্ত করে গজনী প্রত্যাবর্তন করেন।

দিল্লি সালতানাত (পর্ব-১)

দিল্লি সালতানাত বলতে মধ্যযুগে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনকালে বুঝানো হয়। ১২০৬ থেকে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ৩২০ বছর ধরে ভারতে রাজত্বকারী একাধিক মুসলিম রাজ্য ও সাম্রাজ্যগুলি দিল্লি সালতানাত নামে অভিহিত। এই সময় বিভিন্ন তুর্কি ও আফগান রাজবংশ ‍দিল্লি শাসন করে। ১৫২৬ সালে পানি পথের প্রথম যুদ্ধে দিল্লি সালতানাতের পতন হয়।

দিল্লি সালতানাতের ৫টি রাজবংশঃ ১) দাস বংশ (১২০৬–১২৯০), ২) খিলজি বংশ (১২৯০–১৩২০), ৩) তুঘলক বংশ (১৩২০–১৪১৩), ৪) সৈয়দ বংশ (১৪১৩–১৪৫১) ও ৫) লোদি বংশ (১৪১৫–১৫২৬)।

দাস বংশীয় শাসকগণ

সুলতান রাজিয়া

সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেক (১২০৬–১২১০খ্রি.): দিল্লির সালতানাতের প্রথম স্বাধীন সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেক। মুহম্মদ ঘুরীর একজন ক্রীতদাস হিসাবে জীবন শুরু করেন। তিনি ছিলেন তুর্কিস্থানের বাসিন্দা। তিনি উত্তর ভারতে রাজ্য বিস্তার করে দিল্লিতে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন। তিনি ছিলেন উপমহাদেশে স্থায়ী মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর বদান্যতা ও দানশীলতার জন্য তাঁকে লাখবক্স বলা হতো। তিনি আজমিরে ‘আড়াই দিনকা ঝোপড়া’ মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি ভারতের দিল্লিতে ‘কুতুব মিনার’ নির্মাণ করেন।

সুলতান শামসউদ্দিন ইলতুৎমিশ (১২১১–১২৩৬ খ্রি.): সুলতান শামসউদ্দিন ইলতুৎমিশকে দিল্লির সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় । তিনি ‘কুতুব মিনারের’ অসামাপ্ত কাজ সমাপ্ত করেন। ইলতুৎমিম বাগদাদের খলিফা আল মুনতাসির বিল্লাহ কর্তৃক “সুলতান-ই-আজম” উপাধিতে ভূষিত হন। সুলতান ইলতুৎমিশ চল্লিশজন তুর্কি ক্রীতদাসদের নিয়ে একটি দল গঠন করেন যা ইতিহানে “বন্দেগান-ই-চেহেলগান” বা “চল্লিশ চক্র” নামে পরিচিত।

সুলতান রাজিয়া (১২৩৬–১২৪০খ্রি.): সুলতান রাজিয়া ছিলেন ইলতুৎমিশের কন্যা। তিনি দিল্লির সিংহাসনে আরোহণকারী প্রথম মুসলিম নারী। সুলতান রাজিয়ার সমাধি রয়েছে পুরোনো দিল্লীর বুলবুল-ই-খানা মহল্লায়।

বাহরাম শাহ (১২৪০–১২৬৫খ্রি.): সুলতানা রাজিয়ার পর ইলতুৎমিশের তৃতীয় পুত্র বাহরাম শাহ দিল্লীর সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন অকর্মণ্য ও অপদার্থ। তাঁর রাজত্বকালে অভিজাতবর্গের ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি বেড়ে যায়। এই অভিজাতবর্গ ইতিহাসে “চল্লিশের দল” নামে পরিচিত।