দিল্লি সালতানাত (পর্ব-২)

দিল্লি সালতানাত

দাস বংশীয় শাসকগণ

সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন (১২৬৬–১২৮৭ খ্রি.): সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনকে “মহান শাসক” বলা হয়। শাহী দরবারের মর্যাদা ও পুনরুদ্ধারের জন্য এবং শান্তি শৃঙ্খলা লক্ষ্যে “রক্তপাত ও কঠোর নীতি” গ্রহণ করেন। তিনি বিদ্যাৎসাহী ও গুণীজনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ‘ভারতের তোতা পাখি’ (বুলবুলে হিন্দ) নামে পরিচিত আমীর খসরু বলবণের দরবার অলংকৃত করেন।

খলজি বংশীয় শাসকগণ

জালালউদ্দিন খলজি: জালালউদ্দিন খলজি ৭০ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছিলেন খলজি বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর রাজত্বকালে ১২৯১ সালে মোঙ্গলরা দুর্ধর্ষ মোঙ্গল নেতা হালাকু খানের পৌত্র আবদুল্লাহর নেতৃত্বে ভারতীয় উপমহাদেশে আক্রমণ করে। সুলতান সাহসিকতার সাথে মোঙ্গলদের এই আক্রমণ প্রতিহত করে। কিন্তু চেঙ্গিস খানের পুত্র উলুখ খান তাঁর অসংখ্য সমর্থকসহ ইসলাম গ্রহণ করে উপমহাদেশে থেকে যান

আলাউদ্দীন খলজি (১২৯৬–১৩১৬ খ্রি.): আলাউদ্দীন খলজি সুলতান জালালউদ্দিন খলজির ভ্রাতুষ্পুত্র এবং জামাতা ছিলেন। আলাউদ্দীন সুলতান জালালউদ্দীনকে হত্যা করে নিজেকে সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। আলাউদ্দীন প্রথম মুসলমান শাসক হিসাবে দাক্ষিণাত্য জয় করেন। দাক্ষিণাত্য অভিযানে নেতৃত্ব দেন সুলতানের সেনাপতি মালিক কাফুর। তিনি দক্ষিণ–ভারতের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত মুসলিম বিজয় পতাকা উড্ডীন করেন। সুলতান জনগণের সার্বিক কল্যাণের জন্য দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণের উপর হস্তক্ষেপ করেন এবং প্রতিটি দ্রব্যের মূল্য ‍নির্দিষ্ট হারে বেধে দেন। সুলতান ফ্রান্সের রাজা চর্তুদশ লুই এর ন্যায় ঘোষণা করেন, “আমি রাষ্ট্র”। ১৩২০ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাবের শাসনকর্তা গাজী মালিক দিল্লীর সিংহাসন দখল করেন। গাজী মালিকের সিংহাসন আরোহণের মধ্য দিয়েই খলজি বংশের অবসান ঘটে।

আলাউদ্দীন খলজি

তুঘলক বংশীয় শাসকগণ

গিয়াসউদ্দিন তুঘলক: গাজী মালিক একজন তুর্কি ক্রীতদাস ছিলেন। বলবনের রাজত্বকালে তিনি উপমহাদেশে আসেন। একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে জীবন শুরু করে এবং পরবর্তীতে আলাউদ্দিন খলজির রাজত্বকালে তিনি উন্নতির শীর্ষ স্থানে আরোহণ করেন। তিনি সুলতান কর্তৃক “গাজী মালিক” উপাধিতে ভূষিত হয়ে সেনাবাহিনীর রক্ষক পদে উন্নীত হন। পাঞ্জাবের শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়ে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব নিয়োজিত থাকেন।

মুহম্মদ বিন তুঘলক (১৩২৫–১৩৫১): মুহম্মদ বিন তুঘলক রাজ্য শাসনের প্রত্যক্ষ অসুবিধা দূর করার জন্য কেন্দ্রীয় রাজধানী দিল্লি থেকে দেবগিরিতে স্থানান্তর করেন। তিনি সোনা ও রূপার মুদ্রার পরিবর্তে প্রতীক তামার মুদ্রা প্রচলন করে মদ্রামান নির্ধারণ করে দেন। মুহম্মদ বিন তুঘলক কৃষির উন্নয়নের জন্য “দিওয়ান-ই-কোহী” নামে স্বতন্ত্র কৃষি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন “আমির কোহী”।

ফিরোজ শাহ তুঘলক: সংস্কারক হিসেবে ফিরোজ শাহ তুঘলক ভারতের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ আসন অধিকার করে আছেন। ৩৭ বছরের রাজত্বকালে তিনি ২৩ প্রকার করের বিলোপ সাধন করেন। তিনি ৯৬ মািইল দীর্ঘ খাল খনন করে কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন।

সৈয়দ বংশীয় শাসকগণ

খিজির খান: সৈয়দ বংশের প্রতিষ্ঠাতা নিজেকে নবীজির বংশধর দাবি করতেন।

আলাউদ্দিন আলম শাহ: তাঁর রাজত্বকালে রাজনৈতিক সংকট চরম আকার ধারণ করলে তিনি সেচ্ছায় পাঞ্জাবের শাসনকর্তা বাহলুল লোদীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

লোদী বংশীয় শাসকগণ

বাহলুল লোদী: লোদী বংশের প্রতিষ্ঠাতা।

সিকান্দার লোদী: সিকান্দার শাহ উপাধি ধারণ করেন।

ইব্রাহিম লোদী: লোদী বংশের সর্বশেষ সুলতান ছিলেন।

দিল্লি সালতানাতের পতন

পানি পথের প্রথম যুদ্ধ

বাবর ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানি পথের প্রথম যুদ্ধে লোদী বংশের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত ও হত্যা করে দিল্লির সিংহাসন দখল করে মুঘল বংশের ভিত্তি স্থাপন করেন। আর এভাবেই দিল্লি সালতানাতের পতন ঘটে।

ইবনে বতুতার আগমন

ইবনে বতুতা ভারতবর্ষে ‍দুইবার আসেন। প্রথমবার আসেন তুঘলক বংশের মুহাম্মদ বিন তুঘলক এর শাসনামলে ১৩৩৩ সালে। ১৩৪৬ সালে আসেন বাংলায় সোনারগাঁয়ে ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের আমলে। তার ভারতবর্ষ সফরের বর্ণনা পাওয়া যায় তার লিখিত ভ্রমণ গ্রন্থ ‘কিতাবুর রেহালাতে’। তিনি ছিলেন মরক্কোর পরিব্রাজক। বাংলাকে অভিহিত করেন দোযখপুুর নিয়ামত হিসেবে।