বাংলায় মুঘল শাসন

বাংলায় মুঘল শাসন

১৫৩৮ সালে স্বাধীন সুলতানী যুগের অবসান হলে একে একে বিদেশী শক্তিসমূহ গ্রাস করতে থাকে বাংলাকে। মুঘল সম্রাট হুমায়ুন অল্প কিছুকাল বাংলার রাজধানীর ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে আফগান নেতা শেরশাহের কাছে পরাজয় মানতে হয়। বাংলা ও বিহার সরাসরি চলে যায় আফগানদের হাতে। ১৫৭৬ সালে রাজমহলের নিকট মুঘল ও আফগানদের মধ্যে এক তুমুল যুদ্ধ হয়। এতে আফগান শাসক দাউদ কররানীর পরাজয় ঘটলে মুঘল শাসক আকবর বাংলায় মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু সে সময় বাংলায় ‘বারো ভূঁর্ইয়া’ নামে পরিচিত বড় বড়  জমিদারগণ মুঘল শাসন মেনে নেয়নি। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরের সময়ে বারো ভূঁইয়াদের চূড়ান্তভাবে দমন করা হয়।

সুবাদারী ও নবাবি এ দুই পর্বে বাংলায় মুঘল শাসন অতিবাহিত হয়। বারো ভূঁইয়াদের দমন করার পর সমগ্র বাংলায় সুবাদারী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। মুঘল প্রদেশগুলো সুবা নামে পরিচিত ছিল। বাংলা ছিল মুঘলদের অন্যতম সুবা। সম্রাট আওরঙ্গজেবের পর মুঘল শাসন শক্তিহীন হয়ে পড়ে। এ সুযোগে বাংলার সুবাদারগণ প্রায় স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করতে থাকেন। মুঘল আমলের দুই যুগ নবাবি আমল নামে পরিচিত। নবাবদের শাসনকালে পরিধি ছিল ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত।

বারো ভূঁইয়াদের ইতিহাস

সোনারগাও

সম্রাট আকবর পুরো বাংলার উপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। বাংলার বড় বড় জমিদাররা মুঘলদের অধীনতা মেনে নেয়নি। জমিদারগণ তাদের নিজ নিজ জমিদারিতে স্বাধীন ছিলেন। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য এরা একজোট হয়ে মুঘল সেনাপতির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। বাংলার ইতিহাসে এ জমিদারগণ বারো ভূঁইয়া নামে পরিচিত। এ বারো বলতে বারো জনের সংখ্যা বুঝায় না । অনির্দিষ্ট সংখ্যক প্রভাবশালী জামদার বোঝাতেই বারো শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। বারো ভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন ঈশা খাঁ। ঈশা খাঁর মৃত্যু পর নেতা হয় ঈশা খাঁর ছেলে মুসা খাঁ। বারো ভূঁইয়াদের চূড়ান্তভাবে দমন করা হয় সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে। বাংলার বারো ভূঁইয়াদের একজন শক্তিশালী শাসক ছিলেন প্রতাপ আদিত্য। বারো ভূঁইয়াদের চূড়ান্তভাবে দমন করেন সুবাদার ইসলাম খান।

বাংলায় নবাবী শাসন

মুঘল সম্রাটরা যে অঞ্চল দখল করত তাদেরকে বলা হত সুবাহ। সুবাহগুলোতে মুঘলদের প্রতিনিধিত্বের জন্য যে শাসনকর্তা পাঠানো হত তাদেরকে বলা হত সুবাহদার। মুঘলরা বাংলা জয় করে নেয় ১৫৭৬ সালে। বারো ভূঁইয়ারা মুঘলদের বিরোধিতা করে। কিন্তু মুঘলরা বাংলায় বারো ভূঁইয়াদের দমন করে সুবাদারী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। একসময় মুঘল সাম্রাজ্যের ভীত দুর্বল হয়ে আসলে সুবাদাররা আর মুঘলদের অধীনস্ত থাকতে চাইলেন না। তার নবাবী শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। বাংলার উল্লেখযোগ্য নবাব ছিলেন মুর্শিদকুলী খান, আলীবর্দী খান প্রমুখ। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরজ-উদ-দ্দৌলা ছিলেন আলীবর্দী খানের নাতি। বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদকুলী খান। বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব মুর্শিদকুলী খান। বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন মুর্শিদকুলী খান। মারাঠাদের প্রতিহত করেন নবাব আলীবর্দী খান। বাংলার শেষ নবাব নিজাম-উদ-দ্দৌলা।

মুঘল সাম্রাজ্যের পতন

সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহকালীন সময়ে মুঘল সম্রাট ছিলেন দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ। বিদ্রোহে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ বিদ্রোহীদের পক্ষে নেতৃত্ব দেন। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে ইংরেজ সরকার দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে রেঙ্গুনে নির্বাসন দেন। রেঙ্গুুনে নির্বাসিত অবস্থায় ৮৭ বছর বয়সে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। মুুঘল সাম্রাজ্যের পতন হয় ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের মাধমে। মুঘল সাম্রাজ্যের স্থিতিকাল ৩৩১ বছর (১৫২৬-১৮৫৭)। দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ‍নির্বাসন দেয় হয় রেঙ্গুনে, ‍মিয়ানমার। মুঘল আমলে উৎকৃষ্ট কার্পাস দিয়ে তৈরি হতো সমলিন বস্ত্র। মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট ছিলেন দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ। সিপাহী বিদ্রোহের সাথে স্মৃতি বিজরিত স্থান বাহাদুর শাহ পার্ক। দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ মৃত্যুবরণ করেন ১৮৬২ সালে ৮৭ বছর বয়সে।

হতভাগ্য শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ ছিলেন বেদনাহত এক অমর কবি। শেষ বয়সে অসুস্থ অবস্থায় মৃত্যুর পূর্বকালে তিনি দুঃখ করে লিখেছিলেনঃ- “কত হতভাগ্য জাফর, দাফনের প্রয়োজনে দু’গজ জমিও মিলল না স্বজনের জনপদে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published.